এক.
কথায় বলে, ভদ্রতার দাম নেই। এ কথাটি রাজনীতি, সমাজনীতি, বিভিন্ন নীতিতে যেমন সত্য, বিয়ের ক্ষেত্রে ততোধিক বেশি সত্য বলে মনে হয়। যতক্ষণ না ছেলের বিরুদ্ধে পাশের বাড়ীর চালে ঢিল মারার অভিযোগ আসছে ততক্ষণ অনেক অভিভাবক বুঝতেই চাননা ছেলের বিয়ের বয়েস হয়েছে। এক কথায় অনেক অভিভাবকের কাছে ছেলের বিয়ের উপযুক্ততার উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলো ইভটিজিং। ছেলে ইভটিজিং করছে মানেই হলো ছেলের বিয়ের বয়েস হয়েছে, অপরদিকে ছেলেটি ভদ্রভাবে লেখাপড়া করছে, লেখাপড়া শেষে চাকুরী করছে, মাথায় টাক পড়ে যাচ্ছে, চুল পেকে যাচ্ছে, তবু্ও ছেলেটির বিয়ের বয়েস হয়নি, কারন সে অতি ভদ্র।
যে সকল ছেলে মেয়েরা ভদ্রতা বজায় রেখে বিয়ের গোপন ইচ্ছেটা মনের সিন্দুকেই তালাবদ্ধ রাখে, আজকালকার অভিভাবকরা সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান করেন, পারেনতো মনের সিন্দুকটাকে শেকলবন্দী করে সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দেন। অবশ্য এ ক্ষেত্রে মেয়েরা অনেকটা ভাগ্যবতী। অতীতকাল থেকেই মেয়েদের উপাজর্নে বাবা-মা অভ্যস্ত নয় বলে যতদ্রুত পারেন মেয়েকে পার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ইদানিং হঠাৎ করেই অভিভাবকরা অতিআধুনিক হয়ে উঠেছেন, মেয়ের লেখাপড়া শেষে রোজগেরে না হওয়া পর্যন্ত বিয়ের চিন্তা করাকে তারা সেকেলে মনে করেন। ফলাফল, উপযুক্ত পাত্রের অভাবে দীর্ঘকাল আইবুড়ো থেকে থেকে কমবয়েসী ও কম যোগ্যতাসম্পন্ন ছেলেকে বিয়ে করছে।
এক তথ্যে দেখা যায় যুক্তরাজ্যে স্বামীদের চেয়ে স্ত্রীদের বয়স ৫ বছর বেশী, এমনকি সদ্য বিবাহিত প্রিন্স উইলিয়াম ও কেট মিডলটনের মাঝেও ৫ মাসের বয়সের ফারাক।
দুই.
বিয়ের অন্যতম প্রধান উপযোগিতা হল মানসিক সাপোর্ট। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলোতে তাঁর মাথার ওপর বিশাল ছাতা হয়ে ছিলেন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা। যখন সবাই আল্লাহ্র রাসূলকে প্রত্যাখ্যান করছিল, যখন বুকের ওপর আঘাতের পর আঘাতের পাথর চেপে বসেছিল, তখন তিনি দুজন শ্রেষ্ঠ বন্ধুকে পাশে পেয়েছিলেন। স্ত্রী খাদিজা আর বন্ধু আবু বকর। রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
খাদিজার কথা আল্লাহ্র রাসূল সারাজীবনে ভোলেন নি। খাদিজার কাপড় ধরে স্ত্রীকে মনে করতেন, কাঁদতেন। রাসূলের অন্যান্য স্ত্রীদের ওপর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে মর্যাদা দিয়েছিল এই বিষয়টি- স্বামীর জন্য সবচেয়ে বেশি ত্যাগস্বীকার। গোটা দুনিয়া শত্রু হয়ে যাওয়ার সময় আল্লাহ্র রাসূলকে সাহস দেওয়া, প্রেরণা দেওয়া, কষ্ট ভোগের জীবন মেনে নেওয়া।
আল্লাহ্ মানুষকে প্রোগ্রামই করেছেন এইভাবে। একটা ছেলে যখন সংগ্রাম করে, কঠিন সময় পার করে, সেসময় সে পাশে একজন প্রিয় মানুষকে চায়, একজন সঙ্গীর অভাব অনুভব করে; যার মধ্যে সে মানসিক আশ্রয় খুঁজবে, সাহস খুঁজবে, অনুপ্রেরণা পাবে। যে ভালোবাসা দিয়ে তার ভুলগুলো শুধরে দেবে, যে তাকে আল্লাহ্র নিকটবর্তী করবে। এমন একজন মানুষ যার সাথে সবকিছু শেয়ার করা যায়। না বলা অনুভূতিগুলো যাকে শোনানো যায়। যার মুখের দিকে তাকিয়ে অন্তরের বেদনা লাঘব করা যায়, চক্ষু শীতল করা যায়।
অথচ ট্রেডিশান হল এর উল্টোটা। একটা ছেলে তার স্ট্রাগলের সময়গুলো পার করে যখন সেটলড হবে, প্রচুর টাকা কামাবে, প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন আর তার সংগ্রাম থাকবে না, তখন তার হাতে কন্যার মা-বাবা রা মেয়েকে তুলে দিতে চান। এর আগে বিয়ের কথা বলাও পাপ। ত্রিশোর্ধ্ব একটা লাখ টাকা কামানো ছেলে স্ত্রীকে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র আর ঘরের কাজ করার লোকের বাইরে বিশেষ কিছু দেখবে না। কঠিন দিনগুলোতে তো সে একে পায়নি। অথবা ধনীর দুলালের হয়তো কঠিন সময় আসেই নি।
মা-বাবারা ছেলেমেয়েকে প্রচুর খাবার, ভালো কাপড়, ভালো স্কুল কলেজে পড়িয়ে ভাবেন ছেলেমেয়ের সব চাহিদাই তো পূর্ণ করছি। অথচ তা নয়। সুকুন তথা মানসিক প্রশান্তি কখনো মেটাতে পারবে না মা-বাবা। তখন সন্তানের আবেগের জায়গাগুলো হারাম বিনোদন কেড়ে নেয়। যে আবেগ পাওয়ার হক্বদার ছিল স্ত্রী সে আবেগ অন্যত্র ঢেলে দিয়ে বুড়ো বয়সে বিয়ে করে বৌকে কী ভালোবাসবে সে? স্ত্রী তার মনের কতটুকু স্থান দখল করতে পারবে?
এজন্য মা-বাবাদের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ, দয়া করে আপনার ছেলেমেয়ের প্রয়োজনগুলো বুঝুন। টাকার বাইরে যে অনেককিছু আছে সেসব বুঝতে শিখুন। তার জন্য জীবনসঙ্গী/সঙ্গীনীর ব্যবস্থা করুন। আর মেয়ের মা-বাবারা দয়া করে বস্তুবাদী চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসুন। দ্বীনদার যে ছেলেরা মানসিক প্রশান্তির জন্য, চরিত্র হিফাযতের জন্য বিয়ে করতে চায় তাদের কাছে নিজের কন্যাকে হস্তান্তর করুন। সমাজের বিরাট উপকার হবে। কবরে নিয়ে যাওয়ার মত পাথেয় হবে। আল্লাহ্র কাছে প্রতিদান পাবেন।**
**Courtesy - Jubaer Hossain
তিন.
আমার এক আত্মীয়া বললেন তার ছেলে খুবই ডিপ্রেশনে ভোগে--সব সময় একাকিত্বে থাকে।
বললাম : বিয়ে দিয়ে দেন।
তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি শুকনো মাটিতে আছাড় খেয়েছি। বললাম, ইউনিভার্সিটিতে পড়া একটা ছেলেকে বিয়ে না দিয়ে কীভাবে দোকা বানানো যায় জানি না। তিনি বললেন, ছেলের কোনো পছন্দ থাকলে এক কথা ছিল...
ছেলের পছন্দ থাকলে, সে বাড়ি পালানোর হুমকি দিলে, বা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলে সবাই মেনে নেবে।
একই ছেলে যদি মায়ের পছন্দের উপরে ভরসা করে, বাবা-মায়ের মাধ্যমে প্রপার চ্যানেলে বিয়ে করতে চায় সেটা আমাদের সমাজে অকল্পনীয়।
দুনিয়াটা উলটে গেছে। সম্মানীরা সম্মান চান না। হালালগুলো অসম্ভব। হারামগুলোই নর্ম।
courtesy - Sharif Abu Hayat Opu
চার .
আপনার সন্তান জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে!! একজন বিশ্বাসীর কাছে জাহান্নামের আগুনের চেয়ে ভয়ংকর আর কোন দুঃস্বপ্ন হতে পারে না। তাহলে ভেবে দেখুন, দেরী করে বা তার 'প্রয়োজন মত' বিয়ে না দেয়ার জন্য, কবীরা গুনাহর chain reaction -এ পড়ে আপনার ছেলে যদি জাহান্নামী হবার সম্ভাবনা থাকে, আপনার পৃতিস্নেহ কি- 'লোকে কি বলবে', 'ছেলের ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে', 'পর্যাপ্ত ধুমধাম হবে না' ইত্যাদি- মেকী ও ঠুনকো কারণে ছেলেকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ঠেলে দিতে পারে??
- "বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে বিবাহ ও নারীবাদ" বইয়ের পাতা থেকে।
পাঁচ .
মহানবী (সাঃ) এরশাদ করেন-আল্লাহ যাকে নেককার-দ্বীনদারস্ত্রী দান করেছেন, তাকে ,অর্ধেক দ্বীন দ্ধারা সাহায্য করেছেন। এখন তার কর্তব্য হলো সে 'তাক্বওয়া' ও 'খোদাভীরুতা' দ্ধারা বাকী দ্বীন অর্জন করুক।" (কানযুল উম্মাল ১৬:২৭৩)
”একজন পুরুষের সাথে দ্বীনদার নারী হলেন রাজার মাথায় স্বর্ণখচিত মুকুটের মতন, অন্যদিকে একজন পুরুষের সাথে খারাপ নারী হলো বৃদ্ধ ব্যক্তির মাথায় চাপানো ভারী বোঝার মতন।” — আব্দুল-রাহমান ইবনে আবজা (আল-মুসান্নাফ, ১৭৪২৮)
সংকলনে - বিবাহ একটি উত্তম বন্ধুত্ব
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন